বাউল শাহ খোয়াজ মিয়া চিশতীর (জন্ম: ১২ মার্চ ১৯৪২ – মৃত্যু: ২৬ জুন ২০২৫) আধ্যাত্মিক ও সঙ্গীতপ্রেমী জীবন ও কর্ম!
---
প্রারম্ভিক জীবন ও শৈশব 🎵
বাউল খোয়াজ মিয়া চিশতী ১৯৪২ সালের ১২ মার্চ সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মৌলভি আজিজুর রহমান ও মা আছতুরা বিবির ঘরে বেড়ে ওঠা খোয়াজ মিয়া ছোটবেলা থেকেই গান–বাঁশি বাজনায় মগ্ন ছিলেন। পরিবারের অনুশাসন উপেক্ষা করে গ্রামজোড়া বিভিন্ন মেলায় গান গাওয়া তাঁকে শিশু থেকেই বাউল রূপে প্রস্তুত করে তোলে—মাতৃত্বপূর্ণ মরমী মননের সূচনা ।
পড়াশোনা ও সঙ্গীতপথ
খোয়াজ মিয়ার পড়াশোনা মাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে থেমে যায়, কারণ তিনি পড়ার চেয়ে বাঁশি বাজানো ও গান শেখার প্রতি বেশি আকৃষ্ট ছিলেন । পরিবারের অনুরোধে তাঁকে থামানোর প্রচেষ্টা হলেও তিনি নিজেকে সঙ্গীত সাধনায় নিমজ্জিত রাখেন।
গুরু গ্রহণ ও আধ্যাত্মিকতা
১৯৬২ সালে তিনি মরমি সাধক ফকির দুর্বিন শাহের (দুর্বিন টিলা) শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এই গুরু–শিষ্য সম্পর্ক তাঁকে বাউল সাধনায় আধ্যাত্মিক দিক এবং মানবতাবাদী বার্তা প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেয় ।
সঙ্গীতসৃষ্টি ও শোন
খোয়াজ মিয়া গানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্পন্দন জাগিয়ে তুলেন। তার প্রখ্যাত রচনাসমূহ হলো–
“আমার ভয় লাগিল মনেরে, ভয় লাগিল মনে…”
“লাগাইয়া পিরিতের ডুরি, আলগা থাকি টানেরে, আমার বন্ধু মহা জাদু জানে”
“যাইও না যাইও না কন্যাগো…”
“ভুবন‑মোহন রূপ তোমারই…”
এই গানগুলোতে সহজভাবে গভীর আধ্যাত্মিকতা ও প্রেম–ভিত্তিক মানবতাবাদ ফুটে ওঠে, যা বাউল সাধনার সার।
ব্যক্তিজীবন
খোয়াজ মিয়া সম্পূর্ণ নিবিড় ও নির্জন জীবন পছন্দ করলেও গুরুর নির্দেশে ২৫ বছর বয়সে বিয়ে করেন পরিবার কর্তৃক; তবে সংসার জীবনে গানের সাধনা তিনি ত্যাগ করেননি ।
অসুস্থতা ও মৃত্যু
দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ২৬ জুন ২০২৫, বেলা ৩:৩০টার দিকে সিলেট-বিভাগের দৌলতপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন—মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর । তার জানাজা এই ঈদে আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়, পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ।
---
অবদানের প্রতিফলন
বাউল খোয়াজ মিয়া চিশতী ছিলেন এক নিভৃতচারী কিন্তু মানবময় সহজ জীবনের প্রতীক। তাঁর সঙ্গীত সাধনা বাউলধারার মূলমন্ত্রগুলো—ভালোবাসা, নির্যাতিতব্যক্তিমানব, আধ্যাত্মিকতা—সবকিছুই তুলে আনে। ইউথ থেকে বৃদ্ধ—সব শ্রেণী তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত। তিনি ছিলেন গানের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে আলোর বার্তা বয়ে আনার এক সত্যিকারের বাউল দানবেতা।
---
উপসংহার
খোয়াজ মিয়ার জীবন ছিল এক সঙ্গীতবিমুগ্ধ, আধ্যাত্মিক ও মানবিক সত্যের অনুকরণ। গান ছিল তাঁর ভাষা, যেটির মাধ্যমেই তিনি সবার মন টেনে নিতেন। বাংলা বাউল সঙ্গীতে তাঁর অবদান আজও রেখে যায় এক সূচকীয় ছাপ—যা এই জন জাগতিক জীবনের উর্ধ্বে বাহিত অর্থের সন্ধানে পথিকৃৎ ছিল।
---
সার্বিকভাবে, বাউল শাহ খোয়াজ মিয়া চিশতীর জীবন ও কর্ম এক জাগ্রত গানময় আধ্যাত্মিক আন্তরিকতার প্রদর্শন এবং বাউল সাধনার গভীর সৌন্দর্যের পরিচায়ক।
আকাশ
15 Apr, 2026 04:14 PMভাল
আকাশ
15 Apr, 2026 04:14 PMভাল